দেশের সরকারি ও বেসরকারি সকল হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে যেকোনো দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত ব্যক্তির জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে পরিপত্র জারির জন্য স্বাস্থ্যসচিবকে নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। একই সঙ্গে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করে কেবল সড়ক দুর্ঘটনা নয়, বরং ছিনতাইসহ সব ধরনের দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের নিকটের যেকোনো হাসপাতালে বাধ্যবাধকতামূলক প্রাথমিক চিকিৎসার বিধান অন্তর্ভুক্ত করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট ২০২৬) বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ একটি জনস্বার্থমূলক রিট আবেদনের জারি করা রুল আংশিক যথাযথ (অ্যাবসলিউট) ঘোষণা করে এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন।

আদালতের নথিসূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকায় ছিনতাইকারীর নৃশংস আক্রমণের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন খুলনার মোটর পার্টস ব্যবসায়ী ইব্রাহিম। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে তাকে দ্রুত নিকটস্থ সালাউদ্দিন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা না দিয়েই ঢামেক হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেয়। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। উক্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ (এইচআরপিবি) জনস্বার্থে হাই কোর্টে একটি রিট দায়ের করে।

আদালতে এইচআরপিবির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ শুনানি পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ জিসান হায়দার। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে আইনজীবী কাজী এরশাদুল আলম এবং সালাউদ্দিন হাসপাতালের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান মামলায় অংশ নেন।

রায়ের পর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার ও জীবন রক্ষার নীতি প্রতিটি মানুষের অন্যতম সাংবিধানিক অধিকার। হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলো মূলত মানুষকে সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই রাষ্ট্র থেকে লাইসেন্স গ্রহণ করে থাকে; ফলে কোনো সংকটজনক মুহূর্তে কোনো রোগীকে ফেরানো যাবে না। দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তি হাসপাতালে আসামাত্রই জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকদের পেশাগত ‘মেডিকেল এথিক্স’ বা নীতিশাস্ত্রের মূল ভিত্তি।

ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আদালত পর্যবেক্ষণ প্রদান করে জানায়, ভুক্তভোগী পরিবারকে নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় এসে তদন্তের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হলো। হাইকোর্টের এই যুগান্তকারী রায় বাস্তবায়িত হলে দেশের যেকোনো দুর্ঘটনায় জরুরি চিকিৎসার অভাবে প্রাণহানির আশঙ্কা অনেকাংশে কমে আসবে।