https://asia24.tv


বক্তব্য রাখছেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ছবি: -সংগৃহীত
বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আদায়ে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেলেও সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রবণতাই প্রধান হয়ে উঠেছে বলে মত দিয়েছে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির পর্যালোচনা অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। একই সাথে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে দেশের প্রধান তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে রাজধানীর এক মিলনায়তনে সিপিডি আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক জাতীয় মিডিয়া সংলাপে এসব চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়।
সংলাপে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতি নানা কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত ছিল এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও ছিল প্রতিকূল। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর কোনো সমন্বিত ‘শ্বেতপত্র’ বা তথ্যভিত্তিক দলিল প্রকাশ না করায় বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও সাফল্যের যথার্থ মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের কাছে মানুষের মূল দুটি চাওয়া ছিল—অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তবে বাস্তব চিত্রে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তির পাল্লাই ভারী। সরকার পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া সংকটের কথা বারবার বললেও সঠিক তথ্যের দালিলিক প্রমাণের অভাবে সরকারি বক্তব্যের সাথে বাস্তব পরিসংখ্যানের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের মূল রূপরেখা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সিপিডি সরকারের গৃহীত প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপ চিহ্নিত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে মূল্যায়ন চালিয়ে যাচ্ছে।
সুশাসন ও মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় জানান, সিপিডি ১০৫টি ঘটনা পর্যালোচনা করে ভিআইপি সুবিধা বর্জন ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানালেও রাজনৈতিক বিবেচনায় উচ্চপদে পদায়নকে অনভিপ্রেত বলে অভিহিত করেছে। আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা সত্ত্বেও মব জাস্টিস, নারী-শিশু নির্যাতন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা পুরোপুরি থামানো যায়নি। অন্যদিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.১ শতাংশ থেকে ৮.৩ শতাংশে নামলেও সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ভার কমেনি। মজুরি বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো ঋণাত্মক রয়ে গেছে।
অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর চিত্র তুলে ধরে সংলাপে জানানো হয়, চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন ছিল, যা অর্জন প্রায় অসম্ভব। কর প্রবৃদ্ধি ১২.৩ শতাংশ থেকে ৪.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩.৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং নিট বৈদেশিক সহায়তা কমেছে।
শিল্প ও বিনিয়োগ খাতের উদ্বেগজনক চিত্র উপস্থাপন করে সিপিডি জানায়, গত আট মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে বড় ধরনের কর্মসংস্থান বিপর্যয় ঘটেছে। শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে ৪.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল যন্ত্রপাতি) আমদানির এলসি খোলার হার প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১৩.৬ শতাংশে নেমে গেছে।
দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প খাত তীব্র ক্ষতির মুখে পড়েছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি জটিলতা এবং কার্গো সংক্রান্ত সমস্যার কারণে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ ও সিরামিক শিল্পে চরম গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচক ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে।
রেমিট্যান্স ও বাণিজ্য ঘাটতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের প্রবৃদ্ধি ২১.৪ শতাংশ থেকে কমে ১১.৮ শতাংশ হয়েছে এবং বিদেশে কর্মী গমনের মাসিক গড় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১০.৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং চলতি হিসাব ১.৩ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে। অবশ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২.৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিপিডির প্রস্তুত করা ৩১টি অর্থনৈতিক সূচকের স্কোরকার্ডে দেখা যায়, মাত্র ১২টিতে উন্নতি হলেও ১৯টি সূচকে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় সময়মতো তথ্য না পাওয়াকে মূল্যায়নের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন ড. দেবপ্রিয়।
সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ বাতিল, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, প্রবীণদের ভাড়ায় ছাড়, কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুকে স্বাগত জানানো হয়। পাশাপাশি ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত সংস্কারে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন এবং কয়েকটি দুর্বল প্রতিষ্ঠান একীভূত করার পদক্ষেপের প্রশংসার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্বশাসন বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া হয়।
পরিশেষে সিপিডি অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ‘কোর বাজেট’ প্রণয়ন এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতকে সুরক্ষা দিয়ে একটি সর্বাত্মক সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়নের জোর সুপারিশ পেশ করে। ড. দেবপ্রিয় সতর্ক করে বলেন, অর্থনীতির এই মন্দাবস্থা থেকে উত্তরণ এক বছরের মধ্যে সম্ভব নয়, বাংলাদেশ একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।


