https://asia24.tv


ছবি: -সংগৃহীত
রাখাইনে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মম জাতিগত নিধনযজ্ঞের মুখে প্রিয়জনের লাশ ও জ্বলতে থাকা ঘরবাড়ি পেছনে ফেলে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গার বাংলাদেশে পালিয়ে আসার নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ (২৫ আগস্ট)। নতুন-পুরনো মিলিয়ে কক্সবাজার ও ভাসানচরের আশ্রয়শিবিরগুলোতে বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জনে। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়েও আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে মিয়ানমার একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি।
সংকটের ৯ বছর পূর্তির মুখে মিয়ানমার নতুন করে পুরনো বাহানা শুরু করেছে। রোহিঙ্গা বলতে কোনো জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করে তাদের রাখাইনের ‘বাঙালি অধিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করছে নেপিদো। তারা দাবি করছে, ২০১৭ সালের পর বাংলাদেশে ৫ লাখ ৪০ হাজার ‘বাঙালি’ গেছে। অথচ জাতিসংঘের তথ্যে নিবন্ধিত শরণার্থীর সংখ্যা ১২ লাখেরও বেশি। গত ১৫ আগস্ট মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রাখাইনের সাবেক বাসিন্দাকে শনাক্ত করেছে এবং পরিস্থিতি অনুকূল হলে তাদের ফেরানোর ‘নাটক’ করছে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের এই বক্তব্যকে ভুল পরিসংখ্যান নির্ভর ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করে অবিলম্বে সঠিক তালিকার ভিত্তিতে ত্বরান্বিত প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানিয়েছে।
প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ায় একদিকে আশ্রয়শিবিরে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে, অন্যদিকে কমে আসছে আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য। বরাদ্দ সংকুচিত হয়ে জনপ্রতি মাসিক রেশন ১০ ডলারে নেমে আসায় মৌলিক চাহিদা ও সন্তানদের পুষ্টি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে রোহিঙ্গা পরিবারগুলো। মানবিক কারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এখন নিজেই গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
শিবিরগুলোতে শিশু ও তরুণ প্রজন্মের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ১২ লাখের বেশি শরণার্থীর অর্ধেকেরও বেশি শিশু, যাদের একটি বড় অংশের জন্ম এই ঘিঞ্জি ক্যাম্পের ১৫ বর্গফুটের ঘরে। রাখাইনে নিজেদের ভিটেমাটির স্মৃতি পর্যন্ত নেই তাদের চেতনায়। ক্যাম্পের বাইরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যার চেয়ে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে সামাজিক উত্তেজনা ও আইনশৃঙ্খলা অবনতির ঝুঁকি বাড়ছে। জীবন বাঁচাতে ও ভালো উপার্জনের আশায় সমুদ্রপথে বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছে অনেকে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সংকট নিরসনে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে স্পষ্ট করেছেন, মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া দশ বছরের সংকটকে কোনোভাবেই বিশ বছরে রূপ নিতে দেওয়া যাবে না।
রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর বেইজিং প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। মিয়ানমারের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা, সুবিধাজনক বাণিজ্যিক কৌশল এবং হোল-অব-সোসাইটি অ্যাপ্রোচ কাজে লাগাতে পারলে আগামী দু-এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে স্থায়ী প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব।


