শ্রমিক আন্দোলনের নামে দেশকে অস্থিতিশীল করে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তিনি বলেন, অতীতে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছেন, সেভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকলে কোনো ষড়যন্ত্রই তাঁদের রুখতে পারবে না।

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর গোপীবাগে সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মিলাদ, স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলে এসব কথা বলেন ইশরাক হোসেন।

অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালামও বক্তব্য দেন। তাঁরা সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধে অবদান এবং ঢাকা মহানগরীতে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলায় তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করেন।

ইশরাক হোসেন বলেন, তাঁর বাবা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রেখেছিলেন। তাঁর সন্তান হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অতীতেও আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। ভবিষ্যতেও তাঁর নির্দেশনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাজ করে যাবেন।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ইশরাক বলেন, ‘একটি কুচক্রী মহল চেষ্টা করছে, আপনারা দেখেছেন বিগত কয়েক দিন ধরে যে শ্রমিক আন্দোলনের নামে দেশকে অস্থিতিশীল করে একটা নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে দেশকে উদ্ধারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে চেষ্টা করছেন, তাতে তাঁর হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে, যেখানে জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করবে।

ইশরাক বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, যেভাবে বিগত দিনে আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে লড়াই করেছিলাম, তাহলে কোনো ষড়যন্ত্রই আমাদের রুখে দিতে পারবে না।’ বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে একটি গণতান্ত্রিক, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

রাজপথের খাঁটি যোদ্ধা ছিলেন খোকা :

সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, খোকা ছিলেন রাজপথের একজন খাঁটি যোদ্ধা। তিনি কম হাসতেন, কিন্তু তাঁর কথাবার্তা ও আন্তরিকতা মানুষকে সহজেই কাছে টেনে নিত। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও বড় মনের মানুষ ছিলেন।

মির্জা আব্বাস বলেন, তিনি শাহজাহানপুরের এবং খোকা গোপীবাগের বাসিন্দা ছিলেন। পাশাপাশি এলাকার বাসিন্দা থেকে কখন যে তাঁরা একে অপরের সঙ্গী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হয়ে উঠেছেন, তা বুঝতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা—সবখানেই তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন।

খোকার সঙ্গে সম্পর্কের কথা তুলে ধরে মির্জা আব্বাস বলেন, তাঁদের জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে লিখতে বসলে একটি আস্ত বই হয়ে যাবে। রাজনীতিতে মতপার্থক্য কিংবা ঝগড়া হলেও দিনশেষে তাঁরা বিএনপির আদর্শ ও মানুষের জন্য একসঙ্গে কাজ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আজ সে আমাদের মাঝে নেই, সে থাকলে হয়তো বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরও অনেক ভালো কিছু হতে পারত।’

প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, খোকাকে নিয়ে পরবর্তী সময়ে বড় পরিসরে একটি স্মরণসভার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে তাঁর রাজনৈতিক অবদান ও জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে তিনি সাদেক হোসেন খোকার পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানানো এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করার আহ্বান জানান।

খোকা ও আব্বাসের নেতৃত্বে ঢাকায় বিএনপি গড়ে উঠেছে :

ঢাকা মহানগরীতে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলার পেছনে সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে মন্তব্য করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।

তিনি বলেন, তাঁদের নেতৃত্বেই ঢাকা মহানগরীতে বিএনপিকে সুসংগঠিত করা হয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলকে ক্ষমতায় নেওয়া হয়েছে। বিএনপিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া যাবে না, কারণ দলটির পেছনে কোটি কোটি মানুষ রয়েছে।

আবদুস সালাম বলেন, সাদেক হোসেন খোকা শুধু ঢাকা মহানগরী নয়, সারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের মধ্য দিয়ে পাওয়া স্বাধীন দেশে ঢাকার অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন খোকা।

খোকার জনপ্রিয়তার কথা তুলে ধরে আবদুস সালাম বলেন, তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরও সেই জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁর মরদেহ ঢাকার বিমানবন্দরে নিয়ে আসার পর বিমানবন্দর থেকে শুরু করে পুরো সড়কজুড়ে মানুষের ঢল নেমেছিল। তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, ঢাকা শহরের মানুষের কাছে তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন।

বিএনপি জনগণের দল উল্লেখ করে আবদুস সালাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দলের নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ এবং তাঁদের থানার নেতা কমিশনার বাদল সরদারের জানাজায় মানুষের উপস্থিতির মধ্য দিয়েও তা প্রমাণিত হয়েছে।

বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, হুমকি-ধমকি দিয়ে বিএনপির কিছু করা যাবে না। কেউ যদি মনে করেন, একটু ধাক্কা দিলেই বিএনপি পড়ে যাবে, তাহলে ভুল করবেন। বিএনপি জনগণের সঙ্গে আছে। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।

আবদুস সালাম আরও বলেন, বিরোধী দলে থেকে বিরোধিতা করতে হলে সংসদে কথা বলতে হবে। রাজপথে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা উচিত নয়। গত কয়েক দিন ধরে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। বিএনপি দলগতভাবে এখনো এর বিরুদ্ধে মাঠে নামেনি। তবে তারেক রহমানের পেছনে কোটি কোটি মানুষ ও লাখ লাখ বিএনপির নেতাকর্মী রয়েছেন।

দেশের অর্থনীতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন আবদুস সালাম। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট রয়েছে। গত ১৭ বছরে দেশে পর্যাপ্ত গ্যাসকূপ খনন করা হয়নি। তবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর গ্যাসকূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিছুদিন অপেক্ষা করলে এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আবদুস সালাম বলেন, প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা যেভাবে ঢাকা মহানগরীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, মির্জা আব্বাসসহ তাঁরাও সেভাবে মহানগরীকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। ভবিষ্যতেও ঐক্যবদ্ধ থেকে যেকোনো রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা হবে।

দোয়া মাহফিলে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন, জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নবীউল্লাহ নবী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক গোলাম মাওলা শাহীন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেলসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা।

এ ছাড়া ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দলসহ বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ইশরাক হোসেন বলেন, তাঁর বাবার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সবাই উপস্থিত হয়ে দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়ে তাঁকে স্মরণ করেছেন। এ জন্য তিনি ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

সভা শেষে প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।