নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে তীব্র বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় ফুঁসে উঠেছে ফরাসি জনগণ। রাজধানী প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ একপর্যায়ে সংঘর্ষ, দোকানপাটে ভাঙচুর এবং লুটপাটের মতো ঘটনায় রূপ নিয়েছে।
শনিবারের (১৭ অক্টোবর) এসব বিক্ষোভে সহিংসতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে পরিস্থিতিকে ‘চরম মাত্রার সহিংসতা’ বলে বর্ণনা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু। দিনভর সংঘর্ষের পর অন্তত ১২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৫০ পুলিশ সদস্য।
দেশটির রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন সড়কে ভাঙচুর, গাড়িতে আগুন দেওয়া ও দোকানপাট লুটের ঘটনা ঘটেছে। শহরটির মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার বলেছেন, প্যারিসের পুরো পুরো সড়ক ‘বিধ্বস্ত’ হয়ে গেছে। মুখোশ পরা একদল তরুণ পার্ক করা গাড়িতে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি বহু দোকানে ভাঙচুর চালিয়ে মালামাল লুট করেছে।
ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছিল। এর মধ্যে নতুন করে মূল্যস্ফীতিবিরোধী আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ায় দেশটির রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। ছয় মাস পর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া সিজিটি শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ৮ লাখ।
রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে মিছিল চলাকালে সহিংসতা শুরু হয়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। বিক্ষোভকারীরা পাল্টা পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাঁ-এতিয়েনে জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেডের আঘাতে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের ডান হাত উড়ে গেছে।
একের পর এক শহরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ
বিক্ষোভ চলাকালে ও মিছিল শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন শহরের রাস্তায় দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় একদল তরুণ। তারা বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, আগুন দেয় এবং বন্ধ দোকানের শাটার ভেঙে ভেতরে ঢুকে মালামাল লুট করে।
প্যারিস, মার্সেই, নিস, নঁত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গে সুপারমার্কেট, ফার্মেসি, বিলাসপণ্যের দোকান, পোশাকের বিপণি, চশমার দোকান, প্রসাধনসামগ্রীর বিক্রয়কেন্দ্র এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
প্যারিসে এএফপির সাংবাদিকেরা দেখেছেন, প্রায় ছয়জনের ছোট ছোট দল সংগঠিতভাবে বিভিন্ন দোকানে হামলা চালাচ্ছে। মুখোশ ও দস্তানা পরা এসব তরুণ প্রথমে নিরাপত্তা ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। এরপর দোকানের কাচ ভেঙে ভেতরে ঢুকে মালামাল নিয়ে যায়।
লুটপাটের পাশাপাশি বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি শহরের পৌরসভা ভবনও হামলার শিকার হয়েছে।
লিমোজ শহরের ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো পৌর ভবনটি প্রায় পুরোপুরি আগুনে ধ্বংস হয়ে গেছে। আঞ্চলিক প্রশাসনের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা ভবনটিতে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয়। মার্সেই ও লিল শহরের আরও দুটি পৌর ভবনে ঢুকে ভাঙচুর চালানো হয়।
বোর্দো শহরে পুলিশের একটি স্থাপনাও ভাঙচুর করা হয়েছে। অন্যদিকে, লিয়ঁ শহরে বিক্ষোভকারীরা একটি পর্যটন তথ্যকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেন।
ভাঙচুরকারীদের শাস্তির হুঁশিয়ারি প্রেসিডেন্টের
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, যারা ভাঙচুর করেছে, পৌর ভবন, প্রশাসনিক কার্যালয় বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে কিংবা লুটপাট করেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।
এদিকে সহিংসতার ঘটনায় রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেন ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি হতে আগ্রহী বিরোধী নেতারা। আগামী বছরের এপ্রিল ও মে মাসে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
ডানপন্থি প্রার্থী মারিন ল্য পেন ‘দাঙ্গাকারীদের’ নিন্দা করেছেন। তার অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর দল সহিংসতাকে ‘বৈধতা দিয়েছে’।
এক্সে দেওয়া পোস্টে ল্য পেন বলেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে উগ্র বামপন্থিদের সহিংসতা থেকে ফরাসি জনগণকে সুরক্ষা দেবেন।
অন্যদিকে, বিক্ষোভ ও এর আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে জোরালো সমর্থন জানানো মেলঁশোঁ বিক্ষোভকারীদের লুটপাট থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, লুটপাটের ঘটনা তাদের আন্দোলনের পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
‘বিপ্লব’ চায় বিক্ষোভকারীদের একাংশ
আট বছর আগে জ্বালানি কর বাড়ানোর পরিকল্পনার প্রতিবাদে ফরাসি সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিল ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। সেই আন্দোলনের কর্মীরাই শনিবারের ‘হলুদ পোশাক ও তরুণদের’ বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন।
আন্দোলনের প্রধান কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। তবে বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের পেছনে আরও নানা কারণ রয়েছে।
প্যারিসের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চল দিয়ে যাওয়া একটি বড় মিছিলে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। এ সময় তাদের কেউ কেউ ‘সবাই পুলিশকে ঘৃণা করে’ এবং ‘ম্যাক্রোঁ, পদত্যাগ করো’ স্লোগান দেন।
১৮ বছর বয়সী উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী কামিল আলাহিয়ান বলেন, অনেক কারণেই তিনি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৭ সালের নির্বাচন, মিথ্যা বলা রাজনীতিক এবং গত ১০ বছরে ক্রমাগত আরও সম্পদশালী হয়ে ওঠা অতি ধনীরা।
বিক্ষোভকারীদের অনেকে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করেন। মার্সেই শহরে মেয়রের কার্যালয়ে জোর করে প্রবেশের সময় তাদের একাংশকে ‘এটাই বিপ্লব- আমরা বাস্তিল দখল করছি’ বলে স্লোগান দিতে শোনা যায়।
পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লা রশেলে বিক্ষোভকারীরা ‘বিপ্লব অথবা মৃত্যু’ লেখা ব্যানার নিয়ে মিছিল করেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মনপেলিয়ের একটি কেন্দ্রীয় চত্বরে ওড়ানো হয় বিশাল নীল রঙের ব্যানার, যাতে লেখা ছিল ‘জনগণ জয়ী হবে’।
প্যারিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি সংগঠন এলএসইউর প্রধান রিয়াদ রানি বলেন, সরকার কাঁপছে। আর কাঁপাটাই স্বাভাবিক। কারণ ফরাসি জনগণ ক্ষুব্ধ হলে তারা সহজে থামে না।





মন্তব্য করুন