লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়েমেনি বন্দরশহর হোদেইদায় বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের অস্ত্র চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই বিমান হামলায় হুথিদের বেশ কয়েকটি অস্ত্রভাণ্ডার ও চোরাচালানের রুট ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল ১৬ অক্টোবর শুক্রবার ঘটেছে এ ঘটনা। ইতোমধ্যে জোট বাহিনীর পক্ষ থেকে এই হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।
জোটের পক্ষ থেকে হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। প্রায় ছয় মিনিটের এই সাদা-কালো ভিডিওটির শুরুতে তারিখ ও স্থানের উল্লেখ রয়েছে। এতে দেখা গেছে—ট্রাক, ছোট নৌকা এবং সম্ভবত গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত স্থাপনাগুলোর ওপর বিমান হামলা চালানো হচ্ছে।
শনিবার মধ্যরাতের কিছু আগে সৌদি সেনা কর্মকর্তা এবং সৌদি-ইয়েমেন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি তার এক্স অ্যাকাউন্টে এই ফুটেজটি প্রকাশ করেন। তবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু কী ছিল, কী ধরনের অস্ত্র চোরাচালান করা হচ্ছিল কিংবা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত—সেসব ব্যাপারে জোটের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত হোদাইদাহ লোহিত সাগরের একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এবং এটি দেশটিতে চলমান সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। শহরটি ও এর আশপাশের এলাকা বর্তমানে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অস্ত্র স্থানান্তর এবং আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা হুমকি সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এই হামলাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখলের পর থেকেই ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অস্থিরতার এক পর্যায়ে হুথি যোদ্ধারা রাজধানীতে প্রবেশ করে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, যার ফলে তৎকালীন রাজনৈতিক উত্তরণ প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে।
হুথি গোষ্ঠী বারবার সৌদি আরবের সামরিক স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হুথিদের চালানো হামলার মধ্যে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি প্রাণঘাতী হামলাও রয়েছে, যাতে ১৩ জন নিহত হয়েছিল বলে জানা গেছে।
এছাড়া, হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালী ও সংলগ্ন সামুদ্রিক অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার হুমকিও দিয়েছে। লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের সংযোগকারী এই প্রণালীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত পথ। সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি সরবরাহের জন্য এটি একটি প্রধান রুট।
বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথ বেছে নিতে হতে পারে। এতে যাতায়াত খরচ বাড়বে কয়েক গুণ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
জোটের প্রকাশিত সর্বশেষ ফুটেজটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এবং হুথি সামরিক কর্মকাণ্ডের মোকাবিলা করছে। সানা এবং উত্তর ইয়েমেনের অন্যান্য অংশের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক সমাধানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর হাতে হুথিরা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার
ইয়েমেনি সেনা বাহিনী জানিয়েছে, তাইজ প্রদেশে বিভিন্ন ফ্রন্টে সরকারি বাহিনী হুথি যোদ্ধাদের ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সেখানে টানা ৪২তম দিনের মতো লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, “তাইজ শহরের দক্ষিণে আল-শাকাব ফ্রন্টের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের একটি বড় আক্রমণ সশস্ত্র বাহিনী ব্যর্থ করে দিয়েছে। ভোরবেলা শুরু হওয়া তীব্র লড়াইয়ে বহু মিলিশিয়া সদস্য নিহত বা আহত হয়েছে এবং কোনো ধরনের কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে না পেরে আক্রমণকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।”
“শহরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আল-আকরুদ ফ্রন্টে, জাবাল দুহাইহ এলাকায় সশস্ত্র বাহিনী এবং হুথিদের ‘পপুলার রেজিস্ট্যান্স’ বাহিনীর যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চলছে। একই সময়ে পশ্চিম ফ্রন্টের জাবাল হান ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় হুথিদের আক্রমণ ও অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এছাড়া একই অক্ষের আল-দাবাব ফ্রন্টেও লড়াই অব্যাহত রয়েছে।”
সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, গভর্নরেটটিতে হুথিদের বিভিন্ন অবস্থান, জমায়েত, নতুন করে আসা সৈন্যদল এবং সামরিক সরঞ্জামের ওপর বিমান হামলাও চালানো হয়েছে।
সূত্র : আরব নিউজ





মন্তব্য করুন