https://asia24.tv


ইস্তাম্বুলে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর আওতায় প্রথম কমিটির বৈঠকের আগে তোলা ছবি। ৩১ আগস্ট, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স ছবি: -প্রতিনিধি
বিগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পাকিস্তান একদিকে সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংগঠিত করেছে, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের অনানুষ্ঠানিক ব্যাকচ্যানেল যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যম হিসেবে এক সংবেদনশীল দ্বৈত ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি আন্দোলন এবং সৌদি সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে শুরু হওয়া নতুন সীমান্ত লড়াই ইসলামাবাদের এই ভারসাম্য বজায় রাখার কূটনৈতিক সক্ষমতাকে মারাত্মক পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গত মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত তিনপক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোটের এটিই প্রথম বড় ধরনের ব্যবহারিক পরীক্ষা। ইসলামাবাদ ও রিয়াদের মধ্যে পূর্ববিদ্যমান ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অতিরিক্ত হিসেবে গঠিত এই জোটের মূল শর্ত হলো—তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর কোনো বহিরাগত সশস্ত্র আক্রমণ ঘটলে তা সবকটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও তেল অবকাঠামোতে ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়েও বর্তমান হুথি হুমকি পাকিস্তানকে সরাসরি এক আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে টেনে নেওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তারা। ইয়েমেন সংলগ্ন অত্যন্ত সংবেদনশীল সৌদি সীমান্তে ইতোমধ্যে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা সদস্য মোতায়েন রয়েছে, যা তাদেরকে যেকোনো সামরিক সংঘর্ষের সরাসরি কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে পাকিস্তানের পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো উপসাগরীয় শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে এই গভীর সামরিক ও প্রতিরক্ষা সমঝোতা। এসব দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির বদৌলতে পরবর্তীতে উপসাগরীয় পরাশক্তিগুলো থেকে বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়ার পথ সুগম হওয়ার আশা ছিল ইসলামাবাদের।
তবে অন্যদিকে পাকিস্তান হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ দিয়ে আসা অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। হুথি ও ইরানি সামরিক শক্তি যে চাইলেই এই কৌশলগত জলপথগুলোর বাণিজ্যিক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে, তা তারা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার প্রমাণ করেছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক প্রগাঢ় করার পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরানকে পুরোপুরি বলয়চ্যুত করা এড়ানোর বড় কারণ রয়েছে পাকিস্তানের সামনে।
পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান ও ইরানের ঐতিহাসিক সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না; মাঝেমধ্যেই দুই দেশের সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দুই বছর আগে সীমান্ত সংলগ্ন পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে কথিত জঙ্গি আস্তানায় ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলার পর ইসলামাবাদও সমান তালে পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছিল। সেই সময়ে তীব্র সামরিক উত্তেজনায় বড় কোনো যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে উঠলেও পরবর্তীতে তা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় স্তমিত হয়।
বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সংঘাত পুরোপুরি হাতছাড়া হওয়ার আগেই পাকিস্তান কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। চলতি সপ্তাহে তারা সৌদি আরবের দেওয়া একটি কঠোর সতর্কবার্তা তেহরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, যেখানে ইয়েমেনি মিত্র হুথীদের দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করার তাগিদ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সংঘাত হ্রাসে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সরাসরি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সৌদি-হুথি বর্তমান সংঘাত থেকে ইসলামাবাদ নিজেদের কিছুটা আড়ালে রাখতে চায়। কারণ তাদের নিজস্ব অনেক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ এই অঞ্চলের শান্তির সঙ্গে জড়িত এবং তারা কোনো অবস্থাতেই পার্শ্ববর্তী ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে ইচ্ছুক নয়। তাছাড়া হুথীদের ওপর এই মুহূর্তে সামরিক হামলা চালানোর বিষয়টি অন্তত আলোচনার টেবিলে নেই বলে মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান উল্লেখ করেছেন।
প্রকাশ্যে ইরানের সরকার পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রশংসামূলক কথা বললেও, ভেতরে ভেতরে পরিস্থিতি বেশ জটিল। বেশ কয়েকটি ইরানি সূত্র দাবি করেছে, পাকিস্তানের কূটনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও কাতার বা ওমানের মতো অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীদের মতো গভীর সক্ষমতা বা নৈর্ব্যক্তিক অবস্থান তাদের নেই। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত সখ্য এবং সম্প্রতি সৌদি-তুরস্ক ত্রিদেশীয় সামরিক জোটে ইসলামাবাদের যুক্ত হওয়া তেহরানকে খানিকটা সতর্ক করেছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কার্যকর সেনাবাহিনীর মালিক হওয়া সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে নিজস্ব উত্তেজনাপূর্ণ দীর্ঘ সীমান্ত এবং অভ্যন্তরীণ বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ সামলাতে পাকিস্তানি বাহিনীকে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক যোগাযোগ বার্তা আদান-প্রদানে কিছুটা সুবিধা দিলেও, হুথি ও সৌদির মধ্যকার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে ইসলামাবাদ কোনোভাবেই নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না। সক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বা সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়া শুরু করলেই পাকিস্তান আর সাধারণ মধ্যস্থতাকারী থাকবে না, বরং সরাসরি একটি যুদ্ধরত পক্ষে পরিণত হবে—যা তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।


