https://asia24.tv


ছবি: -প্রতিনিধি
কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি। কুঠিবাড়ির প্রধান প্রবেশপথ, মুক্তমঞ্চ, ম্যুরালের সামনের অংশ, জাদুঘরের আঙিনা এবং ফুল-ফলের বাগান—সবখানেই এখন থৈথৈ পানি। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দর্শনার্থীরা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রবীন্দ্রপ্রেমীরা।
পদ্মা নদীর তীর থেকে প্রায় ৮০০ মিটার পশ্চিমে অবস্থিত শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই কুঠিবাড়িতে বসেই তিনি লিখেছেন অসংখ্য গান, কবিতা, নাটক ও ছোটগল্প। ‘গীতাঞ্জলি’র অধিকাংশ রচনাও এখানে বসে লেখা। বাংলা সাহিত্যের বহু অমর সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই কুঠিবাড়ির ইতিহাস।
প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো রবীন্দ্রভক্ত কবির স্মৃতিবিজড়িত এই কুঠিবাড়ি দেখতে আসেন। তবে কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে কুঠিবাড়ির স্বাভাবিক পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুঠিবাড়ির মূল ফটকের সামনে পানি জমে আছে। মুক্তমঞ্চের সামনেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। সেখানে বসে আবৃত্তি কিংবা আড্ডা দেওয়ার সুযোগ নেই। ম্যুরালের পাদদেশ ও জাদুঘরের আঙিনাতেও পানি জমে রয়েছে। ফুল ও ফলের বাগানের গাছগুলো পানিতে নুয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও গাছ উপড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
দর্শনার্থীরা শুধু পাকা ওয়াকিং পথ ব্যবহার করে চলাচল করছেন। ফলে কুঠিবাড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য স্বাভাবিকভাবে উপভোগ করতে পারছেন না তারা।
রাজবাড়ীর পাংশা থেকে আসা দর্শনার্থী হাবিব খান বলেন, ‘কবির বাড়ি দেখার স্বপ্ন অনেক দিনের। এত দূর থেকে এসে দেখি পুরো এলাকা পানিতে ডুবে আছে। ছবি তোলার মতো একটা শুকনো জায়গাও নেই। খুব খারাপ লাগছে।’
রাজশাহী থেকে শিক্ষা সফরে আসা নাহিদ খান বলেন, ‘আমরা ৪০ জন শিক্ষার্থী এসেছি। ভেবেছিলাম মুক্তমঞ্চে বসে কবিতা আবৃত্তি করব। আমবাগানে ছবি তুলব। কিন্তু সেখানেও পানি। কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।’
কুষ্টিয়া শহর থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী ইশতিয়াক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘কুঠিবাড়ি জুড়েই জলমগ্ন। অতিথি নিয়ে এসেছি। এই অবস্থা দেখে তারা বিব্রত। বিশ্ব ঐতিহ্যের এই জায়গার এমন দশা মেনে নেওয়া যায় না। এখানে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকা উচিত।’
দর্শনার্থী আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এটা শুধু কুঠিবাড়ি নয়, এটা আমাদের জাতীয় সম্পদ। প্রতি বছর বৃষ্টিতে একই অবস্থা হয়। স্থায়ী সমাধান কবে হবে?’
টাঙ্গাইল থেকে আসা এটিএম ফরিদুজ্জামান বলেন, ‘কবি এই প্রকৃতি দেখেই লিখেছেন। আর আজ প্রকৃতির পানিতেই কবির স্মৃতি নষ্ট হচ্ছে। এটা দুঃখজনক।’
জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে পড়েছেন কুঠিবাড়ির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। জাদুঘরের ভেতরে ও বাইরে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। উপড়ে পড়ছে গাছ। বাগানের ফুল ও ফলের গাছগুলোও মরার উপক্রম হয়েছে বলে জানিয়েছেন কুঠিবাড়ির কর্মচারী সাকিব হোসেন।
তিনি বলেন, ‘কুঠিবাড়ির পূর্বদিকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে পদ্মা নদী। আগে সড়কের ধারের সরু নালা দিয়ে পানি চলে যেত নদীতে। কিন্তু দখল-দূষণে নালা মরে যাওয়ায় কুঠিবাড়িজুড়ে এমন দুর্দশা।’
কর্তৃপক্ষ বলছে, কুঠিবাড়ির সড়ক ঘেঁষে পানি বের হওয়ার একটি সরু নালা ছিল। দখল ও দূষণের কারণে সেটি অকার্যকর হয়ে গেছে। অন্যদিকে ভারী বৃষ্টিতে কুঠিবাড়ির পেছনের বিলও পানিতে টইটম্বুর। ফলে পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে বিলের পানি কুঠিবাড়িতে ঢুকে পড়ছে। এতে জলাবদ্ধতা আরও বেড়েছে।
শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির কাস্টোডিয়ান আল আমীন বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে দর্শনার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। কুঠিবাড়ির পানি পূর্বের বিলে চলে যেত। কিন্তু এবার ভারী বৃষ্টির কারণে বিলের পানি চলে আসছে কুঠিবাড়িতে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছি। পানি নিষ্কাশনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। না হলে কুঠিবাড়ির অবকাঠামো এবং মূল্যবান প্রত্নসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
তবে দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার।


