অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ল্যাব স্থাপন করে বাসার ভেতরে কুশ চাষের ঘটনায় আলোচিত মূল হোতা তৌসিফ হাসানকে (২২) গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থান করে দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশে বসানো ওই ল্যাবের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও কার্যক্রম তদারকি করতেন তিনি।

দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর রোববার (১ নভেম্বর) সকালে ওয়ারীর র‍্যাংকিন স্ট্রিটের নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ডিএনসির বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়, ঢাকার একটি দল সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবা পাচারের চেষ্টার ঘটনায় অনুসন্ধান করতে গিয়ে তৌসিফের সংশ্লিষ্টতা সামনে আসে। পরে ওয়ারীর বাসায় অভিযান চালিয়ে সেখানে অপ্রচলিত সিনথেটিক মাদক কুশ চাষের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ল্যাবের সন্ধান পান অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

ওই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আনা কুশের বীজ, চাষ করা গাছ, সদ্য সংগ্রহ করা কুশ, চাষের বিভিন্ন উপকরণ, সিসা সেবনের সরঞ্জাম ও বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। বাসার ছাদে টিন ও ফয়েল পেপার দিয়ে তৈরি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত বিশেষ কক্ষেও একাধিক টবে কুশ চাষের প্রমাণ পাওয়া যায়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, তৌসিফ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থানকালে কুশ চাষের কৌশল রপ্ত করেন। পরে দেশে ফিরে নিজের বাসায় বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করেন। বিদেশে অবস্থান করেও প্রযুক্তির মাধ্যমে ল্যাবের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতেন তিনি। এ কাজে তার এক বান্ধবী সহযোগিতা করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এদিকে ওই বান্ধবীর মাধ্যমে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসে ৩২টি ইয়াবা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। ডিএনসির অভিযানে ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় তৌসিফের বান্ধবী ও বাসার তত্ত্বাবধায়ককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ ঘটনায় টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা হয়। মামলায় তৌসিফকে পলাতক আসামি করা হয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল ডিএনসি। অবশেষে আজ (রোববার) সকালে নিজ বাসা থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তার ডোপ টেস্ট করা হলে মেথামফিটামিন ও ক্যানাবিনয়েড-দুই উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

অভিযানকালে তৌসিফের কাছ থেকে ১০টি মেথামফিটামিনযুক্ত ইয়াবা ট্যাবলেট, ১০০ গ্রাম গাঁজা এবং ইয়াবা ও গাঁজা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

ডিএনসি’র উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তৌসিফ ঢাকার বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে ইয়াবা ও কুশ সরবরাহের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছেন। তার মাদক সংগ্রহ ও সরবরাহের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের শনাক্তে অনুসন্ধান চলছে।

উদ্ধার করা ইয়াবা ও গাঁজা নিজ হেফাজতে রাখার অভিযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী তৌসিফের বিরুদ্ধে ওয়ারী থানায় নতুন মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি কুশ ল্যাবের ঘটনায় দায়ের করা আগের মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো এবং রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে ডিএনসি।

এখানে উল্লেখ্য যে, ‘কুশ’ হলো বিশ্বে জনপ্রিয় ও তীব্র প্রতিক্রিয়াশীল এক ধরনের বিশেষ গাঁজা বা ক্যানাবিস ইন্ডিকা প্রজাতিভুক্ত। যা সাধারণ গাঁজার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও মারাত্মক নেশাদ্রব্য হিসাবে পরিচিত। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে এই বিশেষ জাতের গাঁজার উৎপত্তি হওয়ায় এর নামকরণ করা হয়েছে ‘কুশ’। কুশ সেবন করা হয় ফুল শুকিয়ে ধোঁয়া বা ভেপ-এর মাধ্যমে। আবার ল্যাবরেটরিতে তৈরি রাসায়নিক বা সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েড স্প্রে সহায়তায়ও তৈরি হচ্ছে ‘কৃত্রিম কুশ’। যা প্রাকৃতিক কুশের চাইতে শতগুণ শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী। এটি পরিচিত স্পাইস, কে২, পার্টি ড্রাগ বা ফ্যানসি ড্রাগ নামে।