বিশ্বের অন্যতম প্রধান পোশাক বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ডেনিম রফতানিতে নিজেদের শীর্ষস্থান সফলভাবে ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি ডেনিমের চাহিদা ও আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তবে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে এ বাজারে বাংলাদেশের ডেনিম রফতানির মূল্য কমেছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৮৬ কোটি ৯১ লাখ ৩০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম পণ্য গেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম।
তবে আগস্টে রফতানিতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেছে। ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে ডেনিম রফতানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ। এতে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলিত ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো মোট ২৯৫ কোটি ৬২ লাখ ১০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৩০৯ কোটি ২২ লাখ ৭০ হাজার ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাজারটির মোট আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ।
শীর্ষে বাংলাদেশ, কমেছে বাজার হিস্যা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও প্রথম। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউর মোট ডেনিম আমদানির ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে। এ সময়ে বাংলাদেশ রফতানি করেছে ৮৬ কোটি ৯১ লাখ ৩০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম পণ্য।
তবে গত বছরের একই সময়ে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা ছিল ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ রফতানি আয় কমার পাশাপাশি বাজারে বাংলাদেশের অংশও কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশের পর ইইউর ডেনিম সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে পাকিস্তান থেকে ৫২ কোটি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার ইউরো এবং তুরস্ক থেকে ৪৩ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম আমদানি করেছে ইইউ।
বাংলাদেশের রফতানি কমেছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক ডেনিম আমদানি হ্রাসের তুলনায় বেশি। ফলে শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখলেও বাজারে নিজেদের অংশ বাড়াতে পারেনি বাংলাদেশ।
আগস্টে বাড়লো রফতানি
বছরের প্রথম সাত মাসে দুর্বল অবস্থানের পর আগস্টে বাংলাদেশের ডেনিম রফতানিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে ১৩ কোটি ৪ লাখ ৮০ হাজারের কাছাকাছি—সুনির্দিষ্ট হিসাবে ১৩ কোটি ৪ লাখ ৮০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম রফতানি হয়েছে। আগের বছরের আগস্টের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ।
আগস্টে ইইউর মোট ডেনিম আমদানিও বেড়েছে। এ মাসে আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ১৬ লাখ ১৬ হাজার ইউরো, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি।
অর্থাৎ আগস্টে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক বাজারের প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি ছিল। ওই মাসে ইইউর ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ১৭ শতাংশ। গত বছরের আগস্টে এ হার ছিল ৩০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগস্টে ইইউর ডেনিম আমদানিতে যে অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার প্রায় ৩৫ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে। এ প্রবৃদ্ধির ফলে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশের রফতানি আয়ে যে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ পতন ছিল, আট মাস শেষে তা কমে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
তুরস্ক বাজার হারালো, এগিয়েছে চীন ও মিসর
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেনিম বাজারে সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তুরস্কের রফতানি কমে যাওয়ায় বাজারটিতে উল্লেখযোগ্য শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে তুরস্ক থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি কমেছে ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ। অর্থের হিসাবে কমেছে প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক ডেনিম আমদানি কমার পেছনে তুরস্কের রফতানি হ্রাস বড় ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে মরক্কো থেকে আমদানি কমেছে ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। পাকিস্তানের কমেছে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং তিউনিসিয়ার ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
এর বিপরীতে কয়েকটি দেশের ডেনিম রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মিসরের রফতানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৪৬ শতাংশ, চীনের ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
পরিমাণগত হিসাবে মিসরের রফতানি বেড়েছে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো, চীনের ৩ কোটি ইউরো এবং ভিয়েতনামের ১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো।
অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রচলিত প্রতিদ্বন্দ্বীদের কয়েকটি দেশ ইউরোপের বাজারে পিছিয়ে পড়লেও চীন, মিসর ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো রফতানি বাড়াতে পেরেছে। তবে তুরস্কের রফতানি কমে যাওয়ায় যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশ তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
বাজার ধরে রাখতে দ্রুত সরবরাহে গুরুত্ব
ইউরোপের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান এখনো শক্তিশালী। আগস্টের প্রবৃদ্ধিও রফতানির সম্ভাবনা সম্পর্কে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করলেই এ বাজারে অবস্থান ধরে রাখা যাবে না।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউরোপের ক্রেতাদের নতুন ক্রয়াদেশ পেতে দ্রুত পণ্য সরবরাহ, ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন এবং অল্প সময়ে নকশা ও পণ্যে পরিবর্তন আনার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি সরবরাহকারী দেশগুলো এ ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ডেনিম শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রফতানির গতি বাড়ানোর পাশাপাশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত ও নমনীয়ভাবে পণ্য সরবরাহ করা। আগস্টের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।





মন্তব্য করুন