দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় শুরুর ঘোষণা এসেছে। তবে শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রমে এখনো প্রত্যাশিত গতি তৈরি হয়নি। একদিকে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে বিনা অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ, অন্যদিকে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে অভিবাসন খাতে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (BOESL), ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ায় নিয়োগকর্তা খুঁজে কর্মীর চাহিদাপত্র সংগ্রহ, কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। অন্যদিকে, ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি এবং BOESL মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রম, কলিং ভিসা ও ই-ভিসা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী সম্পূর্ণ বিনা অভিবাসন ব্যয়ে নিয়োগে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে এই কর্মী নির্বাচন, যোগ্যতার মানদণ্ড, নিয়োগের সময়সীমা এবং সুবিধাভোগী নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।
২৫ এজেন্সির মাধ্যমে প্রসেসিং, সিন্ডিকেটের আশঙ্কা
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, সিন্ডিকেটনির্ভর নিয়োগব্যবস্থা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।
২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেয়। এর আগে সরকারি ছাড়পত্র ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও অন্তত ১৬ হাজার ৯৭০ জন বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি।
নতুন নিয়োগব্যবস্থায় ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি তালিকাভুক্ত হলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য তাদের ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সির সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। ফলে এই ব্যবস্থায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা, সমান সুযোগ এবং এজেন্সিগুলোর স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু এজেন্সির সংখ্যা বাড়ালেই সিন্ডিকেট বা অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় বন্ধ হবে না। নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, কার্যকর নজরদারি এবং কর্মীদের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা অভিবাসন ব্যয়। অতীতে সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় কর্মীদের কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করার অভিযোগ ছিল।
নতুন শ্রমবাজারে কর্মীদের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হবে, কোন কোন খাতে ব্যয় হবে, নিয়োগকর্তা কতটুকু ব্যয় বহন করবেন এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রকাশ করা জরুরি।
বিশেষ করে ১০ হাজার কর্মীকে বিনা অভিবাসন ব্যয়ে পাঠানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নে সুবিধাভোগী নির্বাচনের স্বচ্ছ মানদণ্ড প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে যারা আগে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য অর্থ ব্যয় করেছেন, কিন্তু নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যেতে পারেননি, তাঁদের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
BMF-এর প্রত্যাশা: কর্মীস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে
বাংলাদেশ মাইগ্রেন্টস ফাউন্ডেশন (BMF) মনে করে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে অতীতের অনিয়ম ও কর্মীদের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটলে এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনবে না।
সংগঠনটির মতে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা অস্বচ্ছ কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ রাখা যাবে না।
এ ছাড়া কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার আগেই নিয়োগপত্র, বেতন, কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা, আবাসন, চিকিৎসাসুবিধা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে লিখিত নিশ্চয়তা দিতে হবে। মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৈধ কর্মসংস্থান ও প্রয়োজনীয় অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
সরকারের কাছে BMF-এর সাত দফা দাবি
১. মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অভিবাসন ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা ও খাতভিত্তিক ব্যয়ের তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
২. ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, কার্যক্রম ও আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. ১০ হাজার কর্মী বিনা অভিবাসন ব্যয়ে পাঠানোর ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নির্বাচনের মানদণ্ড প্রকাশ করতে হবে।
৪. অতীতে অর্থ ব্যয় করেও মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা কর্মীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনরায় কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
৫. অতিরিক্ত অর্থ আদায়, প্রতারণা ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. মালয়েশিয়ায় কর্মরত ও নতুনভাবে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের অভিযোগ গ্রহণ এবং দ্রুত সমাধানের জন্য কার্যকর অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৭. বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (MoU) পর্যালোচনা করে কর্মীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায্য নিয়োগ নিশ্চিত করতে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক বিধান যুক্ত করতে হবে।
শ্রমবাজার খোলার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করা
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। তবে কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন, শুধু সেই পরিসংখ্যান দিয়ে এই উদ্যোগের সফলতা পরিমাপ করা যাবে না। বরং কর্মীরা কত কম খরচে বিদেশে যেতে পারলেন, তাঁদের চাকরি ও বেতন কতটা নিশ্চিত হলো এবং বিদেশে গিয়ে তাঁরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পেলেন—সেটিই হওয়া উচিত সফলতার প্রধান মাপকাঠি।
বাংলাদেশ মাইগ্রেন্টস ফাউন্ডেশন (BMF) মনে করে, কর্মীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
জয়নাল আবেদীন জয়
চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ মাইগ্রেন্টস ফাউন্ডেশন (BMF)





মন্তব্য করুন