চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) নতুন উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানাচ্ছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এরই মধ্যে রাজধানীর শাহবাগে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধনের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। চুয়েটের শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (এইউএসটি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া জাতীয় ছাত্রশক্তিও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
চুয়েটে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের নিয়োগের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংগঠনগুলোও কর্মসূচি পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে বিভিন্ন সংগঠন।
শাহবাগে সমাবেশ ও মানববন্ধন
চুয়েটের সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ এবং শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধনের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় অবস্থানরত চুয়েটের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
বুয়েট ও আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংহতি
চুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ১২ অক্টোবর দেওয়া বিবৃতিতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করারও দাবি জানান তারা।
এদিকে চুয়েটের শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়েছে আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে চুয়েটের চলমান পরিস্থিতি ও উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়, একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষা ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান নয়, বরং স্বাধীন চিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ চর্চার ক্ষেত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মতামত উপেক্ষা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
চুয়েটের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে আসছেন উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিবৃতিতে বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা কেবল আনুষ্ঠানিক নিয়োগের ওপর নির্ভর করে না, বরং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের আস্থা অর্জনের ওপরও নির্ভরশীল। তারা চুয়েটের শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করে নিয়োগ দেওয়া উপাচার্যকে প্রত্যাখ্যানের অবস্থানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
একই সঙ্গে, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বক্তব্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে স্বচ্ছ, যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
জাতীয় ছাত্রশক্তির প্রতিবাদ
চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের কার্যালয়ে প্রবেশের সময় তালা ভাঙার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় ছাত্রশক্তি। সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক সরদার নাদিম মাহফুজ শুভ স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের পাশে থাকার কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বাত্মক অসহযোগ
চুয়েটে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংগঠনগুলো। ১২ অক্টোবর চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে।
সংগঠনগুলোর দাবি, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল করতে হবে এবং চলমান সংকটের সমাধান করতে হবে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে তারা।
চুয়েটে অচলাবস্থা
এর আগে, ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন। পরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতিতে যোগ দেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
১২ অক্টোবর (সোমবার) সকালে উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ক্যাম্পাসে গিয়ে প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে নিজ কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কার্যালয়ের ফটকে আবার তালা দেন। তারা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান নেন। মঙ্গলবারও উপাচার্যকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রেখেছে শিক্ষার্থীরা। এখনও অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন ভিসি শরীফুল।





মন্তব্য করুন