দেশের পর্যটন খাতকে আরও গতিশীল ও আকর্ষণীয় করে তুলতে বিশ্বমানের সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য পর্যটন মেলা। পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বেলুন উড়িয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কক্সবাজার সদর আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। নারী সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না ও জেলা প্রশাসক এম এ মান্নানের কবুতর ওড়ানোর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় মেলার।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের মতে, চলমান সময়ে বিশ্বে সম্ভাবনাময় শিল্প পর্যটন। পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকতকে ঘিরে দেশের পর্যটনের রাজধানী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে কক্সবাজার। এক দশক আগেও ছুটির দিন ও শীত মৌসুমে কক্সবাজার পর্যটকে ভরপুর থাকতো। কিন্তু সম্প্রতি বছরজুড়েই পর্যটকের আনাগোনা থাকছে এখানে। সেই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের পর্যটনকে বিশ্বময় করতে কাজ করছে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।

তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছরের মতো এবারো বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী পর্যটন মেলা। উদ্বোধনী দিনেই লোকারণ্য হয়ে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ। সাগরের নির্মল হাওয়া উপভোগে বেলাভূমিতে বিচরণের পাশাপাশি মেলা প্রাঙ্গণে সুরের মূর্ছনায় দুলছেন পর্যটক ও দর্শনার্থীরা।

মেলার উদ্বোধন উপলক্ষে লাবনী বিচের উন্মুক্ত মঞ্চে জেলা প্রশাসক এম এ মান্নানের সভাপতিত্বে ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানের সঞ্চালনায় কক্সবাজার সদর আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, কক্সবাজারকে অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। এরই মধ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। যার মূল লক্ষ্য কক্সবাজারকে বিশ্বময় করে গড়ে তোলা।

এমপি কাজল আরও বলেন, অতি শিগগিরই কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্বোধন করতে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার আসবেন। বিশেষায়িত ব্লো-ইকোনমী বিশ্ববিদ্যালয়, পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন করাসহ সরকারের নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আগামী দিনের স্মার্ট নগরী হবে কক্সবাজার।

তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন কক্সবাজার করতে মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হবে। স্ব স্ব এলাকায় কমিটি গঠন করে, মাদকের বিরুদ্ধে ডাক দিন। যেখানে মাদকের কারবার, সেখানে একসঙ্গে প্রতিবাদ করুন। সামাজিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। সরকার একার পক্ষে সবকিছু সম্ভব নয়, আমাদের সকলকে সহযোগিতা করতে হবে। আমরা কক্সবাজারকে একটা নিরাপদ ও পর্যটক বান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এমপি শামীম আরা স্বপ্না বলেন, সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় কক্সবাজারে উন্নয়নের জোয়ার শুরু হয়েছে। সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলে কক্সবাজার হবে একটি আধুনিক মানসম্মত পর্যটন নগরী।

জেলা প্রশাসন ও বিচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটির তত্ত্বাবধানে সপ্তাহব্যাপী প্রচারণার পর শুরু হওয়া তিন দিনের পর্যটন মেলা উপলক্ষে হোটেল-মোটেলেগুলোতে ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় চলছে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, বাইক, স্পিডবোটসহ নানা অনুষঙ্গেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে টানা বুকিং চলছে তারকা ও নন-তারকা হোটেলগুলোতে। সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় পর্যটকে ভরে গেছে কক্সবাজার।

মেলাকালীন সময়ে সবমিলিয়ে এবার কক্সবাজারে তিন থেকে সাড়ে তিনলাখের বেশি পর্যটকের সমাগম হবে বলে আশা করছেন হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার।

তিনি বলেন, তিন দিনব্যাপী মেলা উপলক্ষে হোটেলগুলোতে ছাড় চলছে। এরই মধ্যে ৮০ শতাংশ রুম অগ্রিম বুকিং হয়েছে।

ট্যুরস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, মেলায় ভরপুর জনসমাগম দিয়ে এবারের মৌসুম শুরু হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে সারা বছর আমরা কক্সবাজারকে এমনই সরগরম অবস্থায় দেখতে চাই। সেভাবেই সবকিছু এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, পর্যটন চাঙ্গা হলে দেশের অর্থনীতি বলিষ্ঠ হয়। প্রতিবছর এ খাত থেকেই দেশের মূল অর্থনীতিতে যোগান হয় হাজার কোটি টাকা। দেশের অখণ্ড ১২০ কিলোমিটার সৈকত প্রকৃতির দান। এটিকে যত্ন করে বিশ্বমানের করে গড়া গেলে কক্সবাজার দেশের অর্থনৈতিক হাব হিসেবে পরিচিতি পাবে। এজন্য সকলের সমন্বয় ও আন্তরিকতা দরকার।

জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইউনূস জানান, এবারের মেলায় ৮০টির মতো স্টল অংশ নিয়েছে। তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস, সায়মন, সী পার্ল, গ্রীন ন্যাচার, সীগাল স্টল সাজিলে মেলাকে সমৃদ্ধ করেছে। মেলাতেই স্বল্প ব্যয়ে তারকা হোটেলের খাবারের স্বাদ পাচ্ছেন আগত পর্যটক ও দর্শনার্থীরা। কক্সবাজারের পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট জিনিসপত্র তুলে ধরা হয়েছে অন্য স্টলগুলোতে। নারী উদ্যোক্তাদের বাহারি পণ্য, আচার, শুঁটকি ও পিঠাসহ হরেক রকমের আয়োজন রয়েছে মেলায়। রোববার পর্যন্ত সৈকতের লাবণী পয়েন্টে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এ আয়োজন চলবে।