ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের চালানো আকস্মিক ও সমন্বিত হামলায় কেঁপে উঠল সৌদি আরব। দেশটির দুটি প্রধান বিমানবন্দরে চালানো হয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় । ৭ অক্টোবর বুধবার চালানো এ হামলায় ৩ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ৩৬ জন। সৌদির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে গত প্রায় ৩ সপ্তাহ ধরে তীব্র সংঘাত চলছে। এই সংঘাত পরিস্থিতির মধ্যেই গত কাল বুধবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং আবহা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে হুথি বিদ্রোহীরা। হুথি মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারী বলেছেন, বিমান চলাচলের অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো ধারাবাহিক হামলার অংশ হিসেবেই সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে এসব হামলা চালানো হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যার পর এক বিবৃতিতে সৌদির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একজন নিহত ও আটজন আহত এবং আবহা বিমানবন্দরে দুজন নিহত ও ২৮ জন আহত হয়েছেন।

পৃথক এক বিবৃতিতে ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবারের শুরুর দিকে হুথি বিদ্রোহীরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবাহী ড্রোন দিয়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগরের তীরবর্তী বন্দরশহর এডেনের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা করেছে।

“কায়রো থেকে আসা একটি বিমানের অবতরণের কয়েক মিনিট আগে রানওয়ের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। হুথিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ইয়েমেনের বিভিন্ন অংশের জন্য এই বিমানবন্দরটিই প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশপথ”, বলা হয়েছে পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের লড়াই মূলত বাব আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশের এলাকাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্য সীমিত হয়ে পড়ায় জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে এই নৌপথটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই সপ্তাহে, সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান সহায়তায় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী কৌশলগত এলাকা—বিশেষ করে প্রণালীর কাছে এবং মোচা শহরের আশপাশে—পুনরুদ্ধারের জন্য পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে হুথিরা এসব এলাকা দখল করে নিয়েছিল; তবে সরকারি বাহিনীর এই অগ্রযাত্রা কতদূর পর্যন্ত স্থায়ী হবে, তা অস্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর সংঘাতের রেশ হিসেবে ছড়িয়ে পড়া এই লড়াই ইয়েমেনের দীর্ঘ ১২ বছরের জটিল গৃহযুদ্ধকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। সেইসঙ্গে এ যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে এবং বর্তমানে আরব বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র এ দেশটিকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলেছে।

ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) বুধবার জানিয়েছে, লড়াইয়ের সর্বশেষ ধাপ, অর্থাৎ হুথিদের সঙ্গে ইয়েমেনি ও সৌদি সমর্থিত সামরিক জোটের সংঘাত শুরুর পর থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ রয়টার্সকে বলেছেন, “মানুষ জীবন বাঁচাতে ছুটছে কিন্তু নিরাপদ কোনো আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে না।” তিনি খাদ্য ও আশ্রয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আরও তহবিলের আহ্বান জানান। উভয় পক্ষই বিস্তারিত তথ্য না দিয়েই দাবি করেছে যে লড়াইয়ে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইয়েমেনের কিছু এলাকায় প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে তিনটিই খাদ্যসংকটের মুখে পড়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ হিসেবে সৌদি আরবকে বরাবরই শত্রু মনে করে ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুথি বিদ্রোহীরা। সেই শত্রুতার জের ধরেই সম্প্রতি বারবার সৌদি আরবের বিভিন্ন অবকাঠামো—যেমন বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও পাইপলাইন—লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরানপন্থি এই শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী।