ভারতে ‘নিট’ পরীক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির নিয়োগে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের প্রতিবাদে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। কর্মক্ষম যুবশক্তি বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’কে কাজে লাগিয়ে ভারত যখন উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই এক বিশাল বেকারত্বের সংকটে পড়েছে দেশটি।
সরকারি তথ্যমতে, ভারতে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি হলেও কাজের সুযোগ রয়েছে মাত্র ৬৭ কোটির হাতে। উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশটির মোট বেকারের ৮৩ শতাংশই যুব সম্প্রদায়। সাধারণত উচ্চ শিক্ষা বা পেশাদারি ডিগ্রি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিলেও ভারতে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। সেন্ট্রাল ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির (সিএমআইই) হিসাব অনুযায়ী, স্নাতকধারীদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার স্বল্পশিক্ষিতদের তুলনায় প্রায় নয় গুণ বেশি। এমনকি প্রতি চারজন স্নাতকের মধ্যে একজন পুরোপুরি বেকার।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কোটি কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও বর্তমানে ভারত ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’ বা ‘জবলেস গ্রোথ’-এর চরম উদাহরণে পরিণত হয়েছে। দেশটির জিডিপি বাড়লেও সে অনুপাতে নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর ভারতের অর্থনীতি কৃষি থেকে সরাসরি সেবা খাতে চলে যায়, ফলে কর্মসংস্থান তৈরির মূল চালিকাশক্তি ‘উৎপাদন খাত’ চরমভাবে অবহেলিত থেকে যায়। ২০১৫ সালে জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অবদান ১৭ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা ১২ শতাংশে নেমে এসেছে।
এর ওপর যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও দ্রুত প্রযুক্তির বিকাশ। তথ্যপ্রযুক্তি ও আর্থিক সেবা খাতে এআই-এর প্রভাবে নতুন চাকরির সুযোগ কমছে, অন্যদিকে নির্মাণ ও ভারী শিল্পে যন্ত্রের ব্যবহারে মানুষের শ্রমের চাহিদা কমেছে। সেই সাথে এমএসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতও সরকারি নীতির কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, ভারতের দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থা চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকারি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোতে গত দশ বছরে ১ কোটি ৬০ লাখ তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও মাত্র ১৫ শতাংশ কাজ পেয়েছে, যার পেছনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এই চরম অনিশ্চয়তা, নিয়োগ পরীক্ষার দুর্নীতি এবং কাঙ্ক্ষিত চাকরির অভাবে কোটি কোটি তরুণের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। ফলে কাজের বাজার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে বিপুল সংখ্যক যুবসমাজ এখন চাকরি খোঁজা বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেওয়াই ছেড়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১২ সালে এমন হতাশ তরুণের সংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটিতে।
সূত্র: বিবিসি





মন্তব্য করুন