দেশের সংকটগ্রস্ত আর্থিক খাতে বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে আগামী ১৫ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর অধীনে একীভূত হওয়া বাকি চারটি ব্যাংক থেকেও নিজেদের নিযুক্ত প্রশাসকদের চূড়ান্তভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্য দিয়ে বিতর্কিত ও সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে নতুন পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনুষ্ঠানিকভাবে দাপ্তরিক কাজ শুরু করার পর এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখন থেকে একীভূত হওয়া সকল ব্যাংক কোনো ধরনের বিশেষ তদারকি বা অস্থায়ী প্রশাসকের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিয়মিত আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ব্যাংকিং আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে।

উল্লেখ্য, এই বিশেষ প্রত্যাহার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে গত ৩০ জুলাই এক্সিম ব্যাংক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসক সরিয়ে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৫ আগস্টের মধ্যে ধাপে ধাপে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক থেকেও নিযুক্ত প্রশাসকদের স্থলাভিষিক্ত করে নতুন প্রশাসনিক পর্ষদের কাছে দায়িত্ব পুরোপুরি হস্তান্তর করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংকের আমানত, ঋণের হিসাব এবং সার্বিক তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো একীভূত করার প্রাথমিক সমন্বয় নিশ্চিত করতেই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, “বর্তমানে ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। একই ব্যাংকে পাশাপাশি প্রশাসক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বহাল থাকলে নীতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরির আশঙ্কা থাকে। তাই সার্বিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই প্রশাসকদের সরিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচটি ব্যাংকের সার্বিক মূল প্রশাসনিক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল ব্যাংকিং সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তি সুরক্ষা বলয় এবং আন্তর্জাতিক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সংক্রান্ত হিসাব ব্যবস্থার পূর্ণ সংযোজন প্রক্রিয়াটি বর্তমানে চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। এই কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রযুক্তিগত সেবা আগের ব্যাংকগুলোর নামে পরিচালিত হলেও, তথ্যপ্রযুক্তিগত একীভূতকরণ সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথেই সার্বিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর একক পরিচয়ে পরিচালিত হবে।

প্রশাসনিক পর্যায়ক্রম ব্যাখ্যার সময় কর্মকর্তারা জানান, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রথম পর্যায়ে এক্সিম ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে কেন্দ্রীয় দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড শুরু করায় সেখান থেকেই প্রথম প্রশাসক প্রত্যাহার করা হয়েছে। ১৫ আগস্টের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই অবশিষ্ট ব্যাংকগুলোর দায়িত্বও নতুন পর্ষদ পুরোপুরি বুঝে নেবে।

বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জিং হিসেবে মন্তব্য করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শাইরুল হাসান বলেন, “ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক প্রশাসনিক একীভূতকরণ ও আধুনিকায়ন একটি জটিল প্রক্রিয়া। তবে জাতীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই পদক্ষেপ সফল করা অপরিহার্য। এই ব্যাংকিং পুনর্গঠন সফল না হলে পুরো আর্থিক খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত। বর্তমানে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ও মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”

বিগত সরকারের আমলে এই পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতেন নজরুল ইসলাম মজুমদার। আর বাকি চারটি ব্যাংক (সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ও ইউনিয়ন ব্যাংক) ছিল আলোচিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলো গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে অন্তর্বর্তী সরকার খাতটি পুনর্গঠনে ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করে। এতে সরকার সরাসরি ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে এবং অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের জমার বিপরীতে শেয়ারে রূপান্তর করা হবে।