https://asia24.tv


ছবি: -প্রতিনিধি
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনে সরকারের ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে জাতীয় স্বার্থ, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নগাথা বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার রাজধানীতে সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি আয়োজিত ‘আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলন ও বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ সব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রথম জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যাচ্ছেন। ফলে এবারের অধিবেশনটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা দেশের জন্য একটি নতুন যাত্রা ও উচ্চাশার বার্তা বহন করে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে, যেখানে দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, মহামারি প্রতিরোধ, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং টেকসই উন্নয়ন অধিকারের ৪০তম বার্ষিকীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে বিশ্বনেতারা আলোচনা করবেন।
এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলকের কথা উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সাইপ্রাস প্রায় এক দশক ধরে এ পদের জন্য জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ এই গৌরব অর্জন করেছে। বিদেশে অবস্থিত ৮৩টি কূটনৈতিক মিশনের নিরলস কাজ এবং দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ফলেই এই বিশাল সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলোতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের, বিশেষ করে নারী সদস্যদের অসামান্য সাহসিকতা ও অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অত্যন্ত সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত।
অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর বিশেষ আলোকপাত করে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফেরাতে সরকার ব্যাপক সংস্কার কাজ হাতে নিয়েছে। বিনিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করার লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্ট’ ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে ওয়ান-স্টপ সেবা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সব নাগরিককে একই সূত্রে যুক্ত করতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, প্রবাসীদের সুনির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০২৭ সালের মধ্যে ২ লাখ ‘প্রবাসী কার্ড’ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মানবাচার ও অবৈধ অভিবাসন রোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, মানব পাচারকারী চক্রের অপরাধমূলক তৎপরতার কারণে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এই সমস্যা চিরতরে দূর করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি পৃথক ‘মাইগ্রেশন উইং’ বা অভিবাসন শাখা গঠন করা হয়েছে। যেসব এলাকা থেকে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেশি, সেগুলো চিহ্নিত করে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অবৈধ অভিবাসন রোধ ও দক্ষ জনশক্তি বিশ্ববাজারে পাঠাতে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাথে যৌথভাবে কাজ চলছে। পাশাপাশি বাণিজ্য ও পর্যটন উৎসাহিত করতে সম্প্রতি ভিসা নীতি সহজ করা হয়েছে এবং বিমানবন্দর পরিষেবায় বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প মাধ্যম খোঁজা হচ্ছে। জ্বালানি সংকট কাটাতে আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে যোগাযোগের পাশাপাশি এলএনজির নতুন উৎস অনুসন্ধান করা হচ্ছে। একই সাথে সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে ত্বরান্বিত করার কাজ চলছে। পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে শতভাগ সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানি বহুমুখীকরণে পাট ও মসলিনের মতো ঐতিহ্যবাহী পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রসারে জোর দেওয়া হচ্ছে। আসন্ন জাতিসংঘ অধিবেশন ও তুরস্কে অনুষ্ঠেয় জলবায়ু সম্মেলনে পাটজাত পণ্যের বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজন করা হবে।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সুনির্দিষ্ট হস্তক্ষেপ দাবি করে তিনি বলেন, অধিবেশন চলাকালে এ বিষয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হবে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জটিল আঞ্চলিক রাজনীতি ও স্বার্থের সংঘাতের কারণে দিন দিন এ সংকট আরও জটিল রূপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি ছাড়া এই স্থায়ী সমস্যার সমাধান কঠিন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশকে কেবল বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অবৈধ অভিবাসীদের দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করার দিন শেষ। ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনাময় একটি আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকার ও জনগণকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশির চেয়ারম্যান এম এস সেকিল চৌধুরী জানান, তাঁদের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রবাসীদের মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করা।


