ঢাকা
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertise with us

দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগে ডব্লিউএইচও থেকে সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ

ডেস্ক রিপোর্ট
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬   ৪ বার পঠিত
দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগে ডব্লিউএইচও থেকে সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ

সায়মা ওয়াজেদ।  ছবি: -ফাইল ছবি

অর্থনৈতিক অনিয়ম, প্রতারণা ও জালিয়াতির একাধিক আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অভিযোগের মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের মর্যাদাপূর্ণ পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা পরিবারের ওপর বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক ও আইনি চাপের মুখে এই বড় ধরনের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের খবর সামনে এলো।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সায়মা ওয়াজেদ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংস্থায় তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে পাঁচ বছরের নির্ধারিত মেয়াদে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সায়মা ওয়াজেদ। তবে দায়িত্ব নেওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির মারাত্মক সব অভিযোগ উঠতে শুরু করে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে ডব্লিউএইচও কর্তৃপক্ষ তাঁকে বেতনবিহীন প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠাতে বাধ্য হয়। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁকে প্রথম দফায় ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। ডব্লিউএইচও-র এই প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে পৃথক একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তদন্তে উঠে আসা প্রধান প্রধান অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল চীনে সরকারি সফরকালে আর্থিক অনিয়ম সম্পাদন এবং ডব্লিউএইচও-তে জমা দেওয়া নথিপত্রে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য উপস্থাপন। তবে গত ৩ জুলাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে লেখা এক দীর্ঘ চিঠিতে সায়মার আইনজীবীরা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।

উক্ত চিঠিতে আরও জানানো হয়, সংস্থাটি সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অবৈধ উপায়ে মূল্যবান সরকারি জমি অর্জনের মারাত্মক অভিযোগও তুলেছে। এই বিষয়ে সায়মার দাবি, আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগ দেওয়ার অনেক আগেই তিনি ওই জমির মালিকানা লাভ করেছিলেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য বিশেষ সুবিধা সম্বলিত রাষ্ট্রীয় আইনের আওতাতেই তিনি বিধিসম্মতভাবে ওই জমি লাভ করেন।

পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, আঞ্চলিক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটে নির্বাচিত হয়ে তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে নিজ দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছিলেন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ডক্টর টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের নেতৃত্বাধীন মূল সংস্থা তাকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের কোনো সুযোগ দেয়নি। ফলে সংস্থার নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক আচরণের ওপর তিনি পুরোপুরি আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রায় এক বছর ধরে কোনো বেতন না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত আর্থিক পরিস্থিতি চরম সংকটজনক ও অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। এমতাবস্থায় সম্মানজনক পথ হিসেবে পদত্যাগের কোনো বিকল্প তাঁর কাছে ছিল না।

পদত্যাগের পর উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিয়ে নতুন করে কোনো মন্তব্য করতে চাননি সায়মা ওয়াজেদ। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি। তবে গত মাসে সংস্থাটি সংক্ষেপে জানিয়েছিল যে সায়মা প্রশাসনিক ছুটিতে রয়েছেন এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরে চলমান তদন্তের বিষদ তথ্য তারা প্রকাশ করবে না।

এর আগে রয়টার্স দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে খবর প্রকাশ করেছিল যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সায়মা ওয়াজেদকে পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারণ করার সব আইনি প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একটি কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এই শূন্য পদের জন্য আগামী ১২ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন পুনঃমনোনয়ন আহ্বান করা হতে পারে। পরবর্তীতে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রার্থীদের তথ্যাদি যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৭ সালের ২৪ জানুয়ারি নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে।

উল্লেখ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকরা আন্তর্জাতিক বিশ্ব স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে থাকেন। বিশ্বের যেকোনো মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঠেকানো, স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থায় কার্যকর সাড়া দেওয়া এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিসমূহ স্থানীয় প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া তাঁদের মূল দায়িত্ব। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের এই পদের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতসহ এ অঞ্চলের সদস্যরাষ্ট্রগুলো পাঁচ বছরের মেয়াদে ভোট দিয়ে পরিচালক নির্বাচন করে থাকে।

এদিকে সায়মার বিরুদ্ধে চীনে সফরকালীন প্রায় ৯০১ ডলারের একটি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে, যা তাঁর আইনজীবীদের ভাষ্যমতে সহকারী কর্মকর্তার একটি ভুল আবেদনজনিত ভুল বোঝাবুঝি। শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ের জবাবে সায়মা জানান, অটিজম নিয়ে কাজ করার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশে একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছিলেন এবং সে বিষয়টি নিয়োগের শুরুতেই মহাপরিচালক টেড্রোসকে স্পষ্ট করা হয়েছিল। তবে সব বিতর্ক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই পদত্যাগের ঘটনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের ওপর বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া চরম আইনি ও কূটনৈতিক বিপর্যয়ের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।

Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us
আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
SuMoTuWeThFrSa