https://asia24.tv


ছবি: -ফাইল ছবি
একসময় সংক্রামক রোগ নির্মূলের সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালেও বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই সংকটময় পরিস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) বৈশ্বিক তালিকার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ নিয়মিত বুলেটিন থেকে জানা যায়, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে একজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুইজনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। নতুন এই মৃত্যু নিয়ে দেশে নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গজনিত কারণে মোট মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে রেকর্ড ১,০০২ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০০ জন এবং কেবল উপসর্গ নিয়ে ৯০২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৬৯ জনের দেহে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় সৃষ্ট অস্থিরতায় সারাদেশে নিয়মিত টিকাদান সূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি পরিবর্তন, মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের অভাব এবং আন্তর্জাতিক কেনাকাটা সংক্রান্ত জটিলতায় দেশে ব্যাপক টিকার ঘাটতি তৈরি হয়।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ২০২৪ সালে নিয়মিত টিকাদান স্থগিত হওয়া এবং পরবর্তী বছরে নির্ধারিত দেশব্যাপী বিশেষ ‘হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন’ বাতিল করার ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক শিশু চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে যেসব শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে এবং যাদের এখনও প্রথম ডোজের নিয়মিত টিকা দেওয়ার বয়স হয়নি, তারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে মোট আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
দেশের প্রখ্যাত মহামারী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ট্র্যাজিক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসা ইতিহাসে হামের কারণে এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু আগে কখনো দেখা যায়নি। দ্রুততম সময়ে টিকাদানের এই বিশাল ঘাটতি পূরণ ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোই এখন রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
হামের এই প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি দেশজুড়ে ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণ জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা খাতকে এক চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ বছর ডেঙ্গু নিয়ে ইতোমধ্যে ৪৫ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। দ্বৈত মহামারীর চাপে দেশের প্রধান হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা জানান, তাঁদের ১,৩৫০ শয্যার হাসপাতালে বর্তমানে ২,৩৫০ জনেরও বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য সংরক্ষিত ৬০টি বেড পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেককে মেঝেতেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। তার ওপর শিশু স্যালাইনের তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শয্যা না পেয়ে ও তথ্যের অভাবে রোগীদের স্বজনেরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
উল্লেখ্য, মহামারী নিয়ন্ত্রণে গত এপ্রিলে শুরু হওয়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাসের বিস্তার পুরোপুরি ঠেকাতে নিয়মিত টিকাদান এবং বিশেষ ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন আরও দ্রুত জোরদার করা আবশ্যক।


