https://asia24.tv


ছবি: -সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একাধিক জেলায় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ঘরোয়া প্রার্থনাসভা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এমনকি নির্মাণাধীন গির্জায় ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক সংঘবদ্ধ হামলা, মারধর এবং ভাঙচুরের ঘটনার পর তীব্র নিরাপত্তা ও প্রাণভয়ে রাজ্যটির বিভিন্ন এলাকায় খ্রিষ্টান সম্প্রদায় তাদের যাবতীয় ঘরোয়া প্রার্থনা ও ধর্মীয় পরিদর্শন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনাটি ঘটে হাওড়ার উলুবেড়িয়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, গত ২৩ আগস্ট রোববার একটি ভাড়া বাড়িতে পুণ্যার্থীদের নিয়মিত প্রার্থনাসভা চলাকালে একদল সশস্ত্র ও উত্তেজিত জনতা জোরপূর্বক ভেতরে প্রবেশ করে। ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ’-এর ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে তারা উপস্থিত খ্রিষ্টান পুণ্যার্থীদের ওপর চড়াও হয় এবং ব্যাপক তণ্ডবলীলা চালায়।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে স্থানীয় প্যাস্টর মিঠুন হাজরা জানান, সাপ্তাহিক প্রার্থনার জন্য নারী ও পুরুষসহ প্রায় ৬০ জন ভক্ত সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে শুরু হওয়া প্রার্থনাসভায় হঠাৎ করেই ৩টার দিকে জয়ধ্বনি দিতে দিতে উগ্র চরমপন্থীরা ঢুকে পড়ে। তারা উপস্থিত নারী-পুরুষ সবাইকে নির্বিচারে মারধর করে। ভাঙচুর চালানো হয় ঘরের সাউন্ড সিস্টেম, পোডিয়াম, চেয়ার, টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্রে। পরবর্তীতে পুলিশ এসে রক্তাক্ত ও আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। চিকিৎসা শেষে থানায় লিখিত অভিযোগ জানানো হলেও ওই এলাকায় আর কোনো ঘরোয়া প্রার্থনার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। হাওড়া গ্রামীণ পুলিশ সুপার অমিত ভার্মা মামলা দায়েরের কথা নিশ্চিত করলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
অধিকার রক্ষা সংগঠন ‘বঙ্গীয় খ্রিষ্টীয় পরিষেবা’-র প্রধান হেরোদ মল্লিক এই সহিংসতাকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ। তিনি জানান, একই দিনে হাওড়ার জগৎবল্লভপুর এবং উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জেও ঘরোয়া প্রার্থনাসভায় একই ধাঁচের হামলা হয়েছে। এছাড়া গত ৫ জুলাই দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুভাষগ্রামে একটি নির্মাণাধীন গির্জা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
শুধু প্রার্থনাসভাতেই নয়, শেষকৃত্যের মতো সংবেদনশীল আচার-অনুষ্ঠানেও চরম বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগ উঠেছে। গত ১৪ আগস্ট পূর্ব বর্ধমানের সাহানগরের সেন্ট ক্ল্যারেট গির্জায় একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলাকালে একদল উগ্র জনতা হানা দেয়। যাজক ফাদার স্যামুয়েল হেমব্রম জানান, মরদেহ কবরে নামানোর পর উত্তেজিত জনতা এসে কবরস্থানের নথিপত্র দাবি করে। প্রতিবাদ জানালে জোর করে মরদেহ কবর থেকে তুলে ফেলতে বাধ্য করা হয়। বাধ্য হয়ে শোকাহত পরিবারকে মরদেহ সেখান থেকে তুলে বর্ধমান শহরের অন্য একটি গোরস্থানে নিয়ে দাফন করতে হয়। প্রশাসনকে ইমেইলে বিষয়টি জানিয়েও কোনো সুরাহা মেলেনি বলে অভিযোগ প্রিস্টের। তবে পূর্ব বর্ধমানের পুলিশ সুপার বিষয়টিকে জমি সংক্রান্ত বিতর্ক বলে দাবি করেছেন।
একইভাবে ২৫ আগস্ট হাওড়ার ঘুসুড়িতে এবং ২৬ আগস্ট পূর্ব মেদিনীপুরের চেক মাইলপোস্ট গ্রামে দুটি পৃথক বাড়িতে প্রার্থনাসভায় হামলা চালিয়ে যাজক ও তাঁর স্ত্রীকে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় আইনজীবীদের হস্তক্ষেপে তাঁরা থানা থেকে ছাড়া পান। বারবার পুলিশি হেনস্থা ও আসামিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এসব হামলার পেছনে মূল ইন্ধনদাতা হিসেবে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘সিংহ বাহিনী’-র নাম উঠে এসেছে। সংগঠনটির সভাপতি দেবদত্ত মাঝি উলুবেড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালানোর কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে দাবি করেন, প্রলোভন দেখিয়ে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের প্রতিবাদেই এই পদক্ষে নেওয়া হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী উন্নয়ন ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু জানিয়েছেন, ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মপালনে ব্যাঘাত ঘটানো রাজ্য সরকারের নীতির পরিপন্থী। জোরপূর্বক ধর্মান্তরের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। অন্যদিকে বিরোধী দল সিপিআই (এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মো. সেলিম এবং শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রদীপ্ত মুখোপাধ্যায় এই পরিস্থিতির জন্য বিরোধী দল বিজেপির উগ্র রাজনৈতিক মেরুকরণকে দায়ী করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিজেপিশাসিত অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও সংখ্যালঘুদের ওপর ভয়ের রাজনীতি কায়েম করার চেষ্টা চলছে। তবে এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে রাজি হননি বিজেপির রাজ্যসভার প্রতিনিধি রাহুল সিনহা।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।


