https://asia24.tv


ছবি: -সংগৃহীত
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি খাত অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। চলমান এই সংকট থেকে স্থায়ী উত্তরণের জন্য আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সংখ্যা বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানির বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে একটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী সুষম জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার রাজধানীর একটি অডিটোরিয়ামে সার্বিক জ্বালানি সংকট নিরসনে ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত জাতীয় ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিইআরসি চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। প্রতিযোগিতাটির মূল বিষয়বস্তু নির্ধারিত ছিল—‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগই নিশ্চিত করবে বাংলাদেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা’। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আয়োজক সংগঠন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। যুক্তি-তর্কের এই জমজমাট আয়োজনে স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিসার্চকে (নিটার) হারিয়ে গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করে সরকারি বাংলা কলেজ। এই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দেশের বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সিনিয়র সাংবাদিকরা বিচারক প্যানেলে দায়িত্ব পালন করেন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতার উদাহরণ টেনে জালাল আহমেদ বলেন, বহু বছর ধরে নিজেদের ভূগর্ভস্থ গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধানে উপযুক্ত নজর না দিয়ে অতিরিক্ত এলএনজি ও তরল জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর করাই আজকের এই নাজুক অবস্থার মূল কারণ। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে মাত্র দুটি ভাসমান এলএনজি রূপান্তর কেন্দ্র বা এফএসআরইউ চালুর ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে বর্তমান চাহিদা সামলাতে জরুরি ভিত্তিতে অন্তত চারটি টার্মিনাল প্রয়োজন। নতুন করে অনুমোদন দেওয়া হলেও একটি এফএসআরইউ পুরোপুরি প্রস্তুত হতে আড়াই বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন পড়ে। সে কারণে কোনো চটকদার কথায় না গিয়ে কার্যকর ও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে।
বিইআরসি প্রধান বলেন, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মতো অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানির অপচয় কমাতে নবায়নযোগ্য শক্তি একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। তবে দেশের বাস্তবতায় সূর্যালোকের উপযোগিতা মূল্যায়ন করা জরুরি। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩ দশমিক ১ থেকে ৩ দশমিক ৯ ঘণ্টার বেশি কার্যকর রোদ পাওয়া যায় না। সে কারণে সৌরবিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে স্টোরেজ প্রযুক্তির আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে কেবল সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য প্রাথমিক জ্বালানির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্র স্থাপনের তীব্র সমালোচনা করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান। বর্তমানে দেশে ১৭ হাজার মেগাওয়াট পিক চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করে রাখা হয়েছে। অতীতের অস্বচ্ছ ও ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে চুক্তিকৃত অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার কারণে সরকারকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার অলস ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ ও ভর্তুকির বোঝা বইতে হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে এসব অতিরিক্ত তেলভিত্তিক ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়ার আহ্বান জানান।
এছাড়া তৈরি পোশাক শিল্প ও রপ্তানি বাণিজ্যের সুরক্ষায় সবুজ বিদ্যুতের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি। আমাদের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির অর্ধেকের বেশি অংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে। সেখানে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতে উৎপাদিত পণ্যের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বড় কারখানাগুলো ইতোমধ্যে নিজস্ব সোলার প্যানেল বসালেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে কম সুদে ৫ শতাংশ হারে অর্থায়নের পথ সুগম করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম সম্প্রসারণের তাগিদ দেন বিইআরসি প্রধান।
১৯৯৬ সালের পর কয়লা নীতিসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় দীর্ঘ তিন দশকেও নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতিমালা তৈরি হয়নি, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। হুট করে এ সংকটের রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি একটি গতিশীল ও টেকসই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।


