ঢাকা
১৭ জুলাই ২০২৬
Advertise with us

বিমানের জানালা দিয়ে ছিটকে পড়তে যাওয়া স্বামীকে যেভাবে বাঁচালেন স্ত্রী

ডেস্ক রিপোর্ট
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬   ১০ বার পঠিত
বিমানের জানালা দিয়ে ছিটকে পড়তে যাওয়া স্বামীকে যেভাবে বাঁচালেন স্ত্রী

ছবি: -সংগৃহীত

স্বামী লিউবিশা কারোভিচকে নিয়ে গ্রিসের থেসালোনিকি থেকে বিমানযোগে জার্মানির মেমিংগেনে যাচ্ছিলেন স্ভেতলানা গ্রকোভিচ মাকসিমোভিচ। কিন্তু পথে ঘটে এক বড় দুর্ঘটনা। বিমানের জানালার কাচ ভেঙে নিচে পড়তে যাওয়া স্বামীকে প্রাণপণ চেষ্টায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনেন গ্রকোভিচ।

সম্প্রতি এমনই ঘটনা ঘটে রায়ানএয়ারের একটি বোয়িং ৭৩৭ ফ্লাইটে। বিমানের জানালা খুলে যাওয়ার ঘটনায় প্রায় বাইরে ছিটকে পড়তে বসা এক যাত্রীর স্ত্রী ভয়াবহ সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তার স্বামীর ‘ডান কাঁধ ও মাথা বিমানের বাইরে চলে গিয়েছিল।’

বিবিসি সার্বিয়াকে তিনি বলেন, প্রায় দুই মিনিট ধরে প্রাণপণ চেষ্টার পর আরও দুই যাত্রীর সহায়তায় তার স্বামীকে বিমানের ভেতরে টেনে আনা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে তাকে ভেতরে টেনে আনি। তার পুরো মুখ বিকৃত হয়ে গিয়েছিল এবং নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল।’

সার্বিয়ার সংবাদমাধ্যম নোভাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে তার দুই পা শক্ত করে ধরে ফেলি। তখন আমার মনে হয়েছিল, মরতে হলে একসঙ্গেই মরব।’

গ্রিসের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ইআরটিকে তিনি জানান, তার মনে হয়েছে বিমানের ইঞ্জিনের একটি অংশ ভেঙে জানালায় আঘাত করে সেটি চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। এরপরই কেবিনে দ্রুত বায়ুচাপ কমে যায় (ডিকমপ্রেশন)। অন্য কয়েকজন যাত্রীও বিস্ফোরণের মতো একটি শব্দ শুনেছেন বলে জানান।

পরিবারের নিয়োগ দেওয়া একজন কারিগরি উপদেষ্টার ধারণা, বিমানের ডান দিকের ইঞ্জিনে ত্রুটির কারণে কিছু ধ্বংসাবশেষ ছিটকে এসে জানালায় আঘাত করে। এতে জানালাটি ভেঙে যায় এবং কেবিনে দ্রুত বায়ুচাপ কমে যায়। তবে তদন্তকারীরা এখনো এ বিষয়ের সত্যতা নিশ্চিত করেননি।

এর আগে কয়েকজন যাত্রী স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, কারোভিচের সিটবেল্ট বাঁধা ছিল। ফলে তার মাথা ও কাঁধ বিমানের বাইরে চলে গেলেও অন্য যাত্রীরা তাকে ধরে রাখতে সক্ষম হন।

মাকসিমোভিচ বলেন, ৬১ বছর বয়সী তার স্বামী গুরুতর আহত হয়েছেন এবং প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে বেঁচে আছে। তার একটি হাত খুব বেশি আহত হয়েছে এবং সেখানে দগ্ধ হওয়ার চিহ্নও রয়েছে। সে ঠিকভাবে কথা বলতে পারছে না, পুরো ঘটনার কথাও তার মনে নেই।’

ইআরটিকে তিনি আরও বলেন, ‘বিমানের কথা শুনলেই সে কাঁপতে শুরু করে। আমিও খুব খারাপ মানসিক অবস্থার মধ্যে আছি। আমাদের জীবন নিয়ে ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, বিমানটি বিধ্বস্ত হবে।’

সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি, যাতে ঘটনাটা ভুলে থাকতে পারি। কিন্তু সেই দৃশ্যগুলো কিছুতেই মাথা থেকে যাচ্ছে না। গতকাল লিফটে উঠতেই হঠাৎ মনে হলো আমি যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।’

‘এখন প্রশ্ন হলো, আমরা আদৌ আর কোনো দিন বিমানে উঠতে পারব কি না,’ যোগ করেন সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, উড্ডয়নের প্রায় ১০ মিনিট পর বিমানটি হঠাৎ প্রায় ৯ হাজার ফুট (প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিটার) নিচে নেমে আসে।

এক বিবৃতিতে রায়ানএয়ার জানায়, শুক্রবার সকালে থেসালোনিকি থেকে মেমিংগেনগামী তাদের ফ্লাইটটি উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই ফিরে আসে, কারণ উড্ডয়নরত অবস্থায় একটি যাত্রীর পাশের জানালা খুলে যায়।

বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে এবং যাত্রীরা টার্মিনালে ফিরে যান। একজন যাত্রী চিকিৎসাসেবা চান এবং থেসালোনিকিতেই তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানায় স্বল্পমূল্যের এই আইরিশ বিমান সংস্থা।

একই ফ্লাইটের যাত্রী ক্রিস্টিনা রেডিও থেসালোনিকিকে বলেন, ‘আমরা সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারি যে কেবিনের বায়ুচাপ কমে গেছে। সবাই চিৎকার করছিল। এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল, কেউ হয়তো ভুল করে জরুরি নির্গমন দরজা খুলে ফেলেছে।’

আরেক যাত্রী সোফিয়া বলেন, ‘আমাদের মনে হয়েছিল বিমানটি বিধ্বস্ত হতে যাচ্ছে। বায়ুচাপ এত দ্রুত কমে গিয়েছিল যে শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছিল। আহত ব্যক্তি রক্তাক্ত ছিলেন এবং অক্সিজেনের ঘাটতি ও মানসিক আঘাতের কারণে তিনি কয়েকবার জ্ঞান হারান।’

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর পুরোনো একটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজটি রায়ানএয়ারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাল্টা এয়ার পরিচালনা করছিল। থেসালোনিকি বিমানবন্দরের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রাপোর্ট গ্রিস জানিয়েছে, ঘটনাটি বর্তমানে হেলেনিক এয়ার অ্যান্ড রেল সেফটি ইনভেস্টিগেশন অথরিটি তদন্ত করছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৬১ বছর বয়সী ওই যাত্রী এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

যেহেতু উড়োজাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এবং ঘটনাটি উত্তর মেসিডোনিয়ার আকাশসীমায় ঘটেছে, তাই তদন্তে একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করছে। এর মধ্যে রয়েছে বোয়িং, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইএএসএ)।

Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us
আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
SuMoTuWeThFrSa